গার্মেন্টসে আগুন: ২৭ লাশ উদ্ধার, ২ তদন্ত কমিটি আশুলিয়া থেকে হাসনাইন ইমতিয়াজ ও চন্দন রায়, ১৪ ডিসেম্বর (শীর্ষ নিউজ ডটকম): রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ায় হা-মীম গ্রুপের একটি পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার দুপুরে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে শতাধিক শ্রমিকের নিহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৭ শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে, সিম সিম জাপান হাসাপাতালে ৭ জন, জামগড়া খলিল জেনারেল হাসপাতালে ২ জন, নাইটেঙ্গেল হাসপাতালে ১ জন, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন, আশুলিয়া নারী ও শিশু কেন্দ্রে ৫ জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে ৩ জন, ফেন্টাসি কিংডমের সামনে ডক্টর হাসপাতালে ৩ জন ও ঘটনাস্থলে ৩ জনের মৃত্যু হয়। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম, ডক্টর হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আব্দুল মতিন, নাইটেঙ্গেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তামান্না বেগম, জামগড়ার খলিল জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল করিম, আশুলিয়া নারী ও শিশু কেন্দ্রের ডাক্তার আজিজুর রহমান এবং আশুলিয়া থানার এসআই মিজানুর রহমান মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করেছেন। নিহতদের মধ্যে ফরিদ, মারুফ, একরাম আলী, হালিমা বেগম, মারিয়া সুলতানা, রুহুল আমিন, অঞ্জনা, জহুরা, টুটুল, হালিমা বেগম, হিমেল, বাবু, মানছুরা ও তানিয়া সুলতানা নামে ১৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি করেছে সরকার, অন্যটি করেছে বিজিএমইএ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ইকবাল চৌধুরীকে প্রধান করে সরকার ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন জানিয়েছেন। তদন্ত কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে তাদের রিপোর্ট প্রদান করতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিজিএমইএ ৩ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানা গেছে। এখনো অনেক শ্রমিক আটকে আছে। ফ্যাক্টরিতে মোট ২২ হাজার শ্রমিক কাজ করে। অগ্নিকাণ্ডে আহতদের সাভারের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে আগুন লাগার দেড় ঘণ্টা পর কারখানার ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। আগুনের সূত্রপাতের প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক নেতা আল-শামীম শীর্ষ নিউজ ডটকমকে জানান, আশুলিয়া-আব্দুল্লাহপুর সড়কের নরসিংহপুর এলাকায় অবস্থিত এ কারখানায় দুপুরের খাবারের সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ১০তলার ক্যান্টিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এ সময় ৯তলার গেট বন্ধ করে দেয়া হলে শত শত শ্রমিক আটকা পড়ে। ফলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী অপর এক শ্রমিক রেজাউল করিম জানান, ৯তলা থেকে লাফিয়ে কমপক্ষে ১০ শ্রমিক মারা গেছে। আহত হয়েছে শতাধিক। তিনি জানান, আটকে পড়া শ্রমিকরা যাতে লাফিয়ে নামতে পারে তার জন্য জাল বিছানো হয়েছে। কারখানার সামনে শত শত লোক আটকে পড়া স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করছে।
খবর পেয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ করছে। সাভার সেনানিবাসের নবম পদাতিক ডিভিশনের মেজর মাসুদের নেতৃত্বে একটি দল উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। আগুনের ঘটনায় আশপাশের সব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইসরাফিল আলম, সাভারের সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ ঘটনাস্থলে রয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রমিন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান ও পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান একে আজাদ চৌধুরী তাকে জানিয়েছে ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনিবারণ যন্ত্র ছিলো। এমনকি ভবনের শ্রমিকরাও এসব যন্ত্র ব্যবহারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের সময় তারা এগুলো কেন ব্যবহার করতে পারেনি তা খতিয়ে দেখা হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২০ জনের মতো নিহত হয়েছে বলে তিনি জানান। হা-মীম গ্রুপের কর্ণধার ও এফবিসিসিআই সভাপতি এ কে আজাদ এ ঘটনার পরপরই জরুরি বৈঠক করেন।
হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লে. (অব.) কর্নেল দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে এখনো তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে নিহত প্রত্যেকের স্বজনকে সরকারের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আশুলিয়া উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা রাব্বি মিয়া। অপরদিকে আহতদের চিকিৎসায় দরকার হলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আফম রুহুল হক। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় অগ্নিকাণ্ডে আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
তার আগে বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে রোগীদের সব ধরনের সহযোগিতার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আহত শ্রমিকরা চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক সমস্যা হলে সরকার সেটা দেখবে। তদন্ত ছাড়া আগুনের ব্যাপারে কিছু বলতে অস্বীকার করেন তিনি।
বিজিএমইএ-এর সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী নিহত প্রত্যেককে এক লাখ টাকা ও আহতদের চিকিৎসার জন্য ২৫ হাজার টাকা সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া লাশ পৌঁছানোর জন্য আরও ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। হা-মীম গ্রুপের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের জন্য আরও এক লাখ টাকা ও আহতদের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানাগেছে।